Thursday, 19 October 2017

গল্পের গরু, একটা সিড়িঙ্গে  গাছ ও অন্যান্য

আমেরিকার সিয়াটেলকে যদি পণ্ডিতেরা উন্নত শহর বলে মানে তাহলে আমি বলব অন্তত কিছু ক্ষেত্রে সিয়াটেলকে সমানে সমানে পাল্লা দেয় আমাদের নদীয়ার দেবগ্রাম। তাও দেবগ্রাম নেহাতই একটা নাম নিতে হয় তাই মায় বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল বলা যেতে পারে।

এই তো, প্রগতিশীল সুশীল সমাজ কিছুতেই কোন কথা একবারে মানে না। তার প্রমাণ চাই, লিংক ( লিংক হ’ল তথ্যের মুখ। যা খুললেই সিধু জ্যাঠার মতো সব বলে দেবে) চাই, ছবি চাই। তা যাক গে আপনাকে বিরক্ত যাতে না করে একটা প্রমাণ স্বরূপ একটা ঘটনা বলে রাখি।

বাংলার মানুষ এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যাবার জন্য এখনো দুটি যানবাহনের উপর নির্ভরশীল এক হ’ল টিন বা কাঠের বাস আর তার সাথে সাইকেল। একটা সাইকেল যে কতকিছু বইতে আর সইতে পারে মায় চালের বস্তা থেকে গরুর বিচালি তা না দেখলে যেকোন মানুষের তার জীবনটাকেই শুধু যাতনাময় মনে হবে। সে যাই হোক। যা বলছিলাম, যারা দূরে কাজ করতে যান তারা এই সাইকেলটাকে বাসের পিছনে যেখানে সিঁড়ি আছে সেখানে ভাল করে বেঁধে রাখেন। পাকা রাস্তায় বাস থামলে তারা নেমে নিজের নিজের সাইকেল নিয়ে গ্রামে চলে যান নিজস্ব ব্যবসায়।  সিয়াটেলে দেখলাম সেবার বাসে বেশ ভীড়। এক্কেবারে সাহসী লোকের মতো একে অপরের বুক ঠুকে না দাঁড়ালেও বাসে দাঁড়াতে হয়। আর বাসের একদম সামনে জায়গা করা আছে। কী আর, সেই সাইকেল। সাইকেল রাখার জায়গা। লোকে নামছে বাস থেকে তারপর নিজের সাইকেল চড়ে বাকি রাস্তা রওনা দিচ্ছে।  আমি ভাবলাম এই জীবনযাত্রা তো আমাদের ওই দেবগ্রাম কি ডায়মণ্ডহারবার সেই ছোটবেলা থেকে দেখছি।  

আসলে যেই গল্পটা আজ শোনাব বলে মনস্থির করেছি সেটা ওই সহনশীল সাইকেলটা না। সাইকেলের সাথে যে বড় ঝুড়িটা বাসের পেছনে রথের চাকার মতোন লাগান আছে সেইটা আর তার মালিক ওই বাসের ছাদে মাথায় গামছা ওকে নিয়ে। ঝুড়িটা যে এই শীর্ণ অথচ পরিশ্রমী লোকটার এগিয়ে চলার রথ এই বক্তব্যটা গল্পে প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু কীভাবে গল্পটা শুরু করা যায় সেটারই সকাল থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছি।  এগুলো কিন্তু আপনার জানা থাকলে পরে গল্পে গল্পে গল্পকারকেও চেনা যাবে তাই না।

যেমন এই ধরুন না, নোবেলজয়ী ডরিস লেসিং তাঁর সংগ্রামী সময়ে পড়ার মতো বই কাছে না পেয়ে  ঠোঙার লেখা পড়ে পাঠতৃষ্ণা মিটিয়েছিলেন।  সেই সময়কার অভিজ্ঞতায় কত উচ্চমানের সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন।  আমি তো তা জানার পর থেকে সেই সকালে প্রথম আলোকে  কাঞ্চনজঙ্ঘা মুকুটের মতো হওয়া থেকে দীঘার সূর্যাস্তের গোধূলি জল ইস্তক বইপত্তর গুছিয়ে রেখে খালি ঠোঙা ছিঁড়ে পড়ছি।  শুধু গল্প লেখাটা হয়ে ওঠেনি। বাকি সব হয়েছে। খিদে ঘুম সব।

এখন গল্প লেখা না হলেও সমাজে যে অনাচার অত্যাচারের সীমা নেই তা বেশ এই ঠোঙা পড়ে বোঝা গেল। তাই ওই আগের গল্পটা বাতিল। ওটা আর লিখে কাজ নেই।  একটা নতুন গল্প শুরু করব তার থেকে এই সামাজিক প্রেক্ষাপটে। পরে এটা এতো জনপ্রিয় হবে যে টিভিসিরিয়াল হ’য়ে যেতে  পারে। কিন্তু সব কিছুর তো একটা শুরু চাই।

এমন ভাবতে ভাবতে পাড়ার গম্ভীরানন্দ গড়করি  দাদার সাথে দেখা।  আমি কেন পাড়ার সকলেই ওনাকে গড় করেন মনে মনে।  তার কারণ তীক্ষ্ণ ওনার জ্ঞান। মোটামুটি মিনিট দশেক কথা বললে জ্ঞানের তীক্ষ্ণতায় গায়ে হুল ফুটে যায়। তাই সকলে ওনার পুরো কথা না শুনে অল্পেই আলাপ শেষ করতে চায়। আমিও তো চালাক না কি! সে যাই হোক। ওনার সাথে কথা বলে ঠিক হ’ল ওসব সিরিয়াল ফিরিয়াল না।  হবে যখন বেশ একটা বড় পর্দার জন্য কিছু হোক।

হঠাৎ মনে পড়ল ঠিক যেমন পটাং করে বাসের টায়ার ফেটে যায় তেমন হঠাৎ করে আমার জ্ঞানচক্ষু উদ্ভাসিত হয়ে মনে হল পৃথিবীর তাবড় তাবড় লেখক কিছু পান না করে কলমে হাত দেননি।  সে সেকালে সোমরস হোক কি একালের মঙ্গলরস।  যেমনি ভাবা অমনি যোগাড় করবার জন্য একটা  কাঁসার ঘড়া ( বাড়ীর খাটের তলায় রাখা ছিল। আমার ঠাকুমার শ্বাশুড়ি মানে আমার বড় ঠাকুমা না কি বিয়েতে এটা পেয়েছিলেন)  নিয়ে গায়ে জামা গলিয়ে রস গ্রহণে মন দিলাম।

রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছি। আকাশে রোদ্দুর বাঁধনহারা তাই যেখানে পারছে চাঁটি মেরে জ্বালাচ্ছে। বাজারের কাছে আসতে প্রলয়প্রখর এগিয়ে এল। একথা সেকথার পর যখন সে জানতে পারল আমি সোমরস থেকে রবিরস কিছু একটা পাবার আকাঙ্ক্ষায় ঘাম ঝরাচ্ছি তখন সে আমাকে হতাশ করল। বলে আজ বাজার বন্ধ। রস কিছু পেতে গেলে রাস্তার ধারের এক খেজুর গাছ দেখিয়ে বলে এতে কিছু থাকলে থাকবে।

একে গরমের দাবদাহ তাতে খেজুর গাছ। আর গাছটা লম্বাও তেমন। কী করি ভেতরে  সাহিত্য রচনার জন্য আকুপাকু অবস্থা। এই অবস্থা শুধু তাঁরাই জানে যারা নদীতে না নেমে নদীর কথা লেখে না সেখানে আমিই বা এই গাছটায় না উঠলে কী করে গাছের কথা লিখব। তাই সেই ঘড়া খানা কোমরে বাঁধলাম তারপর হাঁটু পায়ের পাতা আর সজনে ডাঁটার মতো আমার এই হাত দু খানি নিয়ে প্রবল পরাক্রমে গাছে উঠতে থাকলাম।

গাছে উঠছি আর দেখছি এর আগে কত কত সাহিত্য রচয়িতা এই গাছে আমার মতো উঠেছেন। জায়গায় জায়গায় গাছের ছাল চেঁছে সংগ্রহ করেছেন শক্তের ভেতরে কোমলের আনাগোনা।  এখান থেকেই হয়ত সেই বিখ্যাত ‘সীমার মাঝে অসীম’ আর ‘অসীমের মাঝে সীমা’ র আবিষ্কার।  এই ভাবতে ভাবতে আমি যেন ভেসে যাচ্ছি অসীমের মধ্যে।  আমি এই বিরাট পৃথিবীর এক ক্ষুদ্র মানুষ।

অন্ধকার শেষ হলে যেমন আলো তেমনি এই অসীম শূন্যতাও আমার বোঝার আগেই শেষ হয়ে গেল। ঘড়া,  দড়ি,  লিকপিকে হাত পা শীর্ণ শরীর সমস্ত নিয়ে কঠিন বাস্তবের মতো রাস্তার উপরে আমি চিৎপটাং হয়ে পরলাম। কতক্ষণ জানিনা, যেন ঘুমাচ্ছিলাম। দূর থেকে আওয়াজ আসছে,

মাথায় জল দে, আগে অজ্ঞানতা কাটুক।