Wednesday, 28 June 2017

ঙ - একটি গল্প

( এই লেখাটির অলঙ্করণ করেছে অপরাজিতা আচার্য)  

হায়দ্রাবাদ থেকে আজ রাতের ফ্লাইটে ফিরব ব্যাঙ্গালোর।  সন্ধ্যে হয়ে গেছে তাও  চলছে জেনেরেল ম্যানেজারের সাথে তথ্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ দড়ি টানাটানি।
ভগবানের থেকেও শক্তিমান আর  আল্লার থেকেও পাল্লা ভারী সেই মহামান্য (মানব বা মানবী দুই হতে পারে) ক্লায়েন্টকে তিনি নিবেদন করবেন আমাদের এই তথ্যকোষ। তাই এতো গ্রিল-সেঁকা  চলছে বিপুলায়তন তথ্যভাণ্ডার নিয়ে।  তথ্যের তালুকদারি।
কাজের পরিধিটা ছোট করে বোঝা যাক। এই ধরা যাক আমরা প্রচুর পরিশ্রম করে প্রকাশ করলাম রতন গরমকালে আম বেশী খায়। এইবার তা নিয়ে আমাদের অনুসন্ধান মার্কা কাজ শুরু হল।  তিনি জানতে চান পাকা আম না কাঁচা আম,  সস্তা আম না দামী আম, আম কেটে খান না দাঁত দিয়ে একটা ছোট্ট মুখ কেটে তারপর আমকে চেপে চেপে মুখে শাস নেন। এইসব তথ্যের সাথে আমরা  হয়ত আর একটু জানালাম গরমকালে আমের আমদানি বাজারে বেশী হয় ঠিকই কিন্তু রতন তার জন্য যে গরমকালে বেশি আম খায় তা নয় সে নিদারুণ দাবদাহেই আম খেতে পছন্দ করে।
যাই হোক। যা বলতে চাইলাম এইসব ছাইভস্ম করতে করতে সন্ধ্যে উতরিয়ে গাঢ় হল। সিধুজ্যাঠাকে জিজ্ঞেস করে জানা গেলো এয়ারপোর্ট যেতে মোটামুটি পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগবে। আমাদের টিকিট বলছে আমাদের  আর ঠিক পঁয়তাল্লিশ মিনিটই আছে এই টিকিটে ভ্রমণের জন্য। আমরা পড়ি মরি করে সমস্ত মুঠোফোন একযোগে ট্যাক্সি দেখতে থাকলাম।


বলাই বাহুল্য, এই সময়ে রাস্তায় খালি ট্যাক্সি নেই। পাঁচ মিনিট পাঁচ ঘন্টা মনে হতে থাকল। কপালে বিন্দু বিন্দু শিশিরবিন্দু কিন্তু মনে তাতে কাব্য নেই আছে দুঃসহ দুশ্চিন্তা। অবশেষে একটা খুব ভালো বড় গাড়ী পাওয়া গেলো। আমরা চালককে একটু জোরে গাড়ী চালাতে বলে এক একটা কথা বলছি আর মিনিট হিসেব করছি।
হায়দ্রাবাদ থেকে এয়ারপোর্ট যেতে একটা লম্বা হাইরোড পড়ে যেটা আবার ফ্লাইওভার যা সোজা এয়ারপোর্টকে যুক্ত করেছে পনের ষোল কিলোমিটার পর। সেই টানা উপরসড়ক ধরে আমরা চলতে থাকলাম। মনে হচ্ছে আর একটু জোরে চলুক হয়ত পেলেও পেতে পারি অমূল্য আকাশযান।
যেভাবে গাড়ী চলছে মনে হচ্ছে সময়ে বা সময়ের থেকে  মিনিট পাঁচেক পরে পৌঁছন যাবে। আমরা তিনজন আলোচনা করছি হয়ত একটু অনুনয় বিনয় করলে হয়ত হ্যাঁ হয়ত পেয়ে যাবো। গভীর রাতে পৌঁছে যাবো ব্যাঙ্গালোরে। কদিনের কাজ শেষে রাতে বিশ্রাম নিজের বাড়ীতে। ঠাণ্ডা কম্বলের ওম নিয়ে শান্তি।  হঠাৎ ফটাস আওয়াজ যোগে বাঁ দিকের পেছনের চাকা ফেটে গাড়ী খোঁড়াতে খোঁড়াতে সেই উপরসড়কের মাঝে দাঁড়িয়ে গেলো। যাচ্চলে।
দ্বিতীয় পর্ব:
উপরসড়কে উসেইন বোল্টের মতো দ্রুত চলে যাচ্ছে গাড়ি একটার পর একটা আমাদের পাশ দিয়ে। আমরা তিনজন রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে চিন্তামগ্ন হয়ে ভাবছি কী করা যায়। কর্পোরেট ভাষায় যাকে বলে স্ট্র‍্যাটেজি।
এখানে তিনজনের একটু পরিচয় দেবার দরকার। আমি তো সেই লিকপিকে সিং। বাঙালী। আমার সাথে কেরালার ছেলে ব্রিজিতলাল। সকালে জিমে না গেলে অফিসে মন বসে না। বয়স ত্রিশ। আর রোমানিয়া থেকে এসেছে এই কাজে জোসেফ। আসলে ও গোয়ানিজ পরিবারের ছেলে তবে এখন আর বাবা মা অনেককাল ভারতে থাকে না।  ওর বয়স ত্রিশের একটু বেশী। বুদ্ধিদীপ্ত আর ছিপছিপে চেহারা।  আমি এখানে বয়োজ্যেষ্ঠ।
আমি বললাম, আর চেষ্টা করে লাভ নেই। ঠিক আটটা বিয়াল্লিশ বাজে। আটটা পঁয়তাল্লিশ আমাদের চেক ইন টাইম কারণ সাড়ে নটায় রওনা।
জোসেফ বলল, বুঝছি। অফিসের ট্র‍্যাভেল ডেস্কে একটা ফোন করলে হয় না। যদি ওরা আমাদের ট্র‍্যাভেল রিসিডিওল করে?
আমি বললাম, ভাল কথা। আমিই করছি।  কম্পানির হেল্পডেস্ক নাম্বার ডায়াল করে এক দুই তিন ইত্যাদি বাছাবাছি করে নিজের ক্রমিক সংখ্যা দাবিয়ে অবশেষে কেউ হ্যালো বলল। যেন স্বর্গদ্বার এসেছি। নারায়ণের   কাছে যেতে গেলে এক টিপুন,  কৃষ্ণর কাছে যেতে হলে দুই টিপুন আর সোজা ব্যোমভোলের কাছে নালিস করতে শূণ্য টিপুন।
হ্যালো, আমি হায়দ্রাবাদের এয়ারপোর্ট এর কাছাকাছি উপরসড়কের মাঝে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে আছি আমাদের ট্যাক্সির টায়ার ফেটে গেছে। আমার সাথে আরো দু’জন আছে। আমাদের আকাশযান সাড়ে নটায়। বুঝতেই পারছেন, কোন মতেই তা আর পাওয়া সম্ভব না। আপনি কী পরের কোন যাত্রার ব্যবস্থা করবেন দয়া করে?
একমিনিট স্যার। এটা আপনার কোন এয়ারলাইন্স ?  
নীলদর্পণ আকাশপথ।
ওকে। একটু দেখে নিতে দিন স্যার। উম ম ম এক মিনিট স্যার।  (কিছুটা অপেক্ষা) স্যরি স্যার। আজ আর কোনখানে টিকিট নেই।  একবার চেষ্টা করুন স্যার এটা ‘নো সো’ হলে আপনাকে  নতুন করে সব ব্যবস্থা করতে হবে।
এখানে কথা বলে কিছু লাভ নেই বুঝে মুঠোফোন বন্ধ করলাম।  ইতিমধ্যে বাকি দু’জন চেষ্টা চালিয়েছে যদি অন্য একটা ট্যাক্সি পাওয়া যায়।  সে গুড়ে বালি। এই মাঝরাস্তায় এতো দূরে কে আসবে?  তাও একজনের মুঠোফোনে  দেখালো পনের মিনিট আর একজনকে কুড়ি মিনিট পর ট্যাক্সি আসবে।
পনের কুড়ি মিনিট পর আর এসে কী হবে এই আলোচনা করছি। হঠাৎ একটা হলুদের উপর গাড়ীর নাম্বার লেখা গাড়ী আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। আমরা ভাবলাম ভাড়ার গাড়ী হয়ত আমাদের ট্যাক্সি।
ব্রিজিতলাল বলল না আমার নাম্বারের সাথে মিলছে না। জোসেফও তাই বলল।
হঠাৎ চালক আমাদের সামনে এসে বলল, আপলগ এয়ারপোর্ট যাওগে? মেরা সাথ যাওগে?
আমার সোনারকেল্লার সেই দৃশ্য মনে পড়ল। কাঁচের বোতলে টায়ার ফেটে বিপর্যস্ত ফেলুলালতোপকে তাদের ড্রাইভার বলছে, আপলোগ উটপে যাওগে?
ব্রিজিতলাল বলল, লেটস ট্রাই না! জোসেফ জোরের সাথে সমর্থন করল। আমরা লোটাকম্বল নিয়ে সেই গাড়ীতে কোনরকম দরদাম না করে যেমন চাইল তাতে রাজী হয়ে গিয়ে উঠে পরলাম।
ড্রাইভার ভাই, ইধার সে কিতনা টাইম লাগেগা?
স্যার পন্দরা বিশ মিনিট লাগতা হ্যায়!
আরো পনের কুড়ি মিনিট। আমি হিসেব করে দেখলাম তারমানে ন টা বেজে দশ মিনিট যদি পনের মিনিট লাগে। সাড়ে নটায় রওনা। কেন যে আর চেষ্টা করছি।  তাও চালককে বললাম, ভাইয়া থোড়া জলদিমে হুঁ। সে সাড়া দিল, জি স্যার এয়ারপোর্ট তক তো জলদি যায়েঙ্গে লেকিন উসকে বাদ অন্দর পে ট্র‍্যাফিক তো রাহেগায়।  আমি শুধু হু বললাম।
ইতিমধ্যে জোসেফ সিধুজ্যাঠার মাধ্যম ব্যবহার করে বলল,  আমাদের আকাশযান একদম সঠিক সময়ে ছাড়বে।
আমরা সবাই হাসলাম বেশ জোরে জোরে। আর এক সাথে বললাম আজ আর কিছুতেই বিলম্ব থাকতে পারে ন।
তৃতীয় পর্ব:
সোনারকেল্লার উটে চড়ার  মতো মাঝ রাস্তায় বাহন পরিবর্তন হলো ঠিকই কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে এ গাড়ীর গতি ছিল অনেক বেশি। কিন্তু কত জোরে একটা গাড়ি ভারতের রাস্তায় চালানো যায়! গাড়ি একশ কুড়ি কিলোমিটার গতিতে ছুটছে।  হায়দ্রাবাদের রাস্তাকে সেলাম জানাতেই হয়। এভাবে চললে যা বুঝলাম ড্রাইভারের সাথে কথা বলে, মোটামুটি ন’টা বেজে দশ মিনিটের মধ্যে হয়ত আমরা এয়ারপোর্ট পৌঁছব।  অর্থাৎ হিসেব মতো বোর্ডিং শুরু তো হবেই সম্ভবত বোর্ডিং এর ‘ফাইনাল কল’ হবে আমরা এয়ারপোর্ট পা রাখতে রাখতে।  তাই বলাই বাহুল্য এ যাত্রায় নীলদর্পন আকাশযান এ দিনের বন্ধু হল না। এয়ারপোর্ট গিয়ে অন্যকিছুর ব্যবস্থা করতে হবে।
আমি বললাম, আচ্ছা এখানে কাছাকাছি হোটেল নিশ্চয় থাকবে। সব এয়ারপোর্ট এর কাছেই তো ভালো ভালো হোটেল থাকে।
জোসেফ বলল, হ্যাঁ সে পাওয়া যাবে। তবে হাল ছেড়ো না এতো তাড়াতাড়ি। আমরা একটু কাঁদুনি গাইব যে রাস্তায় প্রচুর ট্র‍্যাফিক।
ব্রিজিতলাল বলল, সে না কি ব্যাঙ্গালোরে একবার বৃষ্টির দিনে প্রজেক্টের কাজে এয়ারপোর্ট আসতে গিয়ে  ট্র‍্যাফিকে ফেঁসেছিল আর এয়ারপোর্ট পৌঁছে দেখেছিল বেশিরভাগ লোক আসতে পারেনি নির্দিষ্ট সময়ে তাই বেশ কয়েকটা আকাশযান বিলম্বে ছাড়ার ব্যবস্থা হয়েছিল।  
আমি ভাবলাম এ ব্যাঙ্গালোরেই সম্ভব। আর বললাম, দেখো, ওরা যদি বলে বাকিরা এসে গেলো কীভাবে আমাদের কিছু বলার থাকবে না। বরঞ্চ যদি কিছু বলতেই হয় আমরা রাস্তায় আমাদের সাথে যেমনটি হলো আমরা তাই বলব। এতে ঘটনা থাকবে  সত্যি তাই বিশ্বাস যোগ্যতা বাড়বে।
আমরা কথা বলতে বলতে অবশেষে এয়ারপোর্ট এসে পৌঁছলাম। ঘড়িতে বাজে ন'টা বেজে বারো মিনিট।  গাড়ির চালককে ভাড়া মিটিয়ে নিজের নিজের তল্পিতল্পা নিয়ে প্রধান প্রবেশপথে এলাম।
প্রথম প্রবেশপথে  যে সিকিউরিটির লোক থাকে তাকে টিকিট দেখানোর সাথে দেখাতে হবে পরিচয়পত্র। আমরা তিনজনই নিজের নিজের পরিচয়পত্র বার করে মুঠোফোনে টিকিট দেখালাম।  সিকিউরিটি কর্মী খুব যত্ন সহকারে মেলাতে লাগল আমাদের নামছবি।  উফ ছাড় না বাবা আমরা ঠিক লোক। বলাই বাহুল্য, এটা মনে মনেই বললাম। সুরক্ষাকর্মীদের সাথে সতত সাহায্যের হাত বাড়ানোই যেকোন সময় যেকোন নাগরিকের অবশ্য কর্তব্য। আমরা কেউই তার অন্যথা করলাম না।
টিকিট পরীক্ষার পর এক ছুটে আমরা গেলাম যেখানে ‘চেক-ইন’ করে বোর্ডিং পাস দেওয়া হবে। কিন্তু এগুলো একটাও নীলদর্পন নয়। তাদের কাউন্টার আরো একটু পেছনের দিকে।  পড়িমরি করে সেদিকে ছুট দিলাম। যখন আমরা কাউন্টারে পৌঁছলাম সেখানে বিস্তর ভিড়।
অ্যাকোরিয়ামে কিছু মাছ যেমন উদ্দেশ্যহীনভাবে একবার এ দেওয়াল একবার ও দেওয়াল ঘুরে বেড়ায় লেজ নেড়ে নেড়ে যেন কোন কাজ নাই এ জীবনে ঠিক তেমনি  এয়ারপোর্টে একদল কর্মী ‘মে আই হেল্প ইউ’ হাতে আর বুকে লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কাছেই তেমন একজনকে ধরে নিল ব্রিজিতলাল।
আমাদের সাড়ে ন’টার  ব্যাঙ্গালোর। আমাদের একটু আগে ব্যবস্থা করতে পারেন?
সাড়ে ন'টার ব্যাঙ্গালোর? এখন ন’টা পনেরো বাজে। আমি জানিনা স্যার আপনারা কতটা উপকার পাবেন। আমার সাথে আসুন। এই যে এই কাউন্টারে কথা বলুন।
আমরা তিনজনই প্রস্তুত কী বলতে হবে। যেন ‘ভাইভা’ চলছে।  আমরা প্রথম শুরু করলাম এইভাবে, সাড়ে ন’টার ব্যাঙ্গালোর আমরা রাস্তায় আটকে গেছিলাম।
ব্যস। ওইটুকু বলার পর নীলদর্পন কর্মী আমাদের আর কিছু বলতে দিলেন না। লে হালুয়া। কিন্তু আমাদের টিকিট নিলেন। তারপর নিজের ‘টার্মিনালে’  কিছু ‘চেক’ করলেন। তারপর একটা ফোন লাগালেন। আমরা দর্শক। যেন রহস্য রোমাঞ্চ সিনেমা দেখছি। কিন্তু লালমোহন বাবুর লেখা গল্প  নয় নিজস্ব ‘আঁখো দেখি’।
স্যার, আমার কাছে তিনজন এসেছেন ব্যাঙ্গালোরের জন্য।
অন্যপারে কী কথা হচ্ছে আমরা অবশ্য শুনতে পাচ্ছি না।
আপাতত আমি কাউন্টার ঙ তে আছি।  ক, খ, গ, ঘ কাউন্টারে অন্য আকাশযানের ‘চেক ইন’ চলছে।
আবার অন্যপারে কিছু কথা। এদিকে আমি ভাবছি ঙ না হয়ে অন্য কোন কাউন্টারে গেলেই হোত কি! ঙ যেন কেমন। বাঙালীর ভেতর একদম ঠিক মাঝখানে  ওই ঙ শব্দের জন্যই হয়ত আজ ‘এই অবস্থা’ এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঙ কে ভালো করে ‘হ্যাণ্ডেল’ করতে পারেননি। সহজপাঠে সবার বেলা কি সুন্দর সব ছন্দ অথচ ঙ র বেলায় কী পেলাম:
‘চরে বসে রাঁধে ঙ
চোখে তার লাগে ধোঁয়া।’
বোঝ। যাই হোক। এই নীলদর্পন কর্মী আবার ঙ তে দাঁড়িয়ে আমাদের কী দেয় তাই দেখার।
তিনি ‘ও কে’ বলে ফোন রাখলেন। আমরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
আপনাদের কোন ‘চেক ইন লাগেজ’ আছে স্যার?
আমরা একে অপরের সাথে কথা বলে নিলাম।
না নেই।
ওকে।
অতঃপর তিনি কী-বোর্ডে টরেটক্কা করে আমাদের অতি আকাঙ্ক্ষিত সেই  বোর্ডিং পাস দিলেন। উফফফ।  কিন্তু সাথে গুঁজে দিলেন একটা ছোট্ট কোমল সতর্কীকরণ।
স্যার তাড়াতাড়ি  ‘সিকিউরিটি চেক’ করে যাবার চেষ্টা করুন। আপনাদের ‘গেট’ তেইশ। একটু দূর। আর কিন্তু সময় নেই।
এটা সতর্কীকরণ কেন খুলে কই। আগেকার দিনে বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করলে আপনাকে না নিয়ে সে আকাশযান এক পা নড়বে না। রওনা দেবার আগে দিকে দিকে তাদের লোকে আপনার নাম আর আকাশযানের নাম ঘোষণা করতে করতে যাবে। যেন সেই ‘আজ কি তাজা খবর, হাতীকে ছেড়ে পিঁপড়ে ধর’ খবরটা বলে  কেউ খবরের কাগজ বেচছে তেমন করে। উদ্দেশ্য যাতে আপনি সাড়া দেন। তারপর সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। এখন আর সেসব নেই। এখন বোর্ডিং পাস পেলেও আপনাকে নির্দিষ্ট সময়ের  ‘ফাইনাল কল’ পর্য্যন্তই তারা সঙ্গে নেবে। যাই হোক এ তো সবাই জানে। তাই সতর্কীকরণ। কিন্তু আমাদের মাথায় আবার  এক বাজ পড়ল। তা  হল তেইশ পর্য্যন্ত আমাদের দ্রুত পৌঁছতে হবে।
তিনজনেই দু হাতে নিজের নিজের লোটাকম্বল নিয়ে দৌড়তে শুরু করলাম।  ঠিক হল, যে আগে পৌঁছবে সে বাকিদের আসার কথা বলে একটু ‘আটকে রাখবে’।  যেন কলকাতার লোকাল বাস। দাদা একজন গলিতে আসছে। আমার লোক। একটু দাঁড়ান। বাস দাঁড়িয়েও থাকে।  যাই হোক।  ব্রিজিতলাল আর জোসেফ প্রায় একসাথে আমার থেকে এগোতে থাকল। প্রথমে দশ মিটার তারপর পঁচিশ পঞ্চাশ মিটার আগে। তারপর আর তাদের দেখতে পেলাম না।  আমিও খুব জোরে দৌড়ে চলেছি। বলাই বাহুল্য সেটা আমার মনে হচ্ছে। কারণ আমি এতোটাই হাঁপিয়ে গেছি মনে হচ্ছে পৃথিবীর তিনভাগ জল দিলেও তেষ্টা মিটবে না। পা দুটো যেন আর চলছে না।
তেইশ নম্বর গেটের কাছে দেখলাম কেউ কোত্থাও নেই একজন শুধু বোর্ডিং পাস চেক করার কর্মী হাত নেড়ে আমাকে ডাকছে। তাঁকে পেরোনোর পর দেখি জোসেফ আর ব্রিজিতলাল আকাশযানের দরজায় দাঁড়িয়ে আমার অপেক্ষায়।
যখন আকাশযানে ঢুকলাম ভর্তি লোক। আমরা তিনজন শুধু বসতে বাকি।  আমাকে হাঁপাতে দেখে এক বিমান সেবিকা আমার ‘সিট নাম্বার’ জানতে চাইল। আমি এতক্ষণ সেই আকাঙ্ক্ষিত বোর্ডিং পাস দেখবারই সময় পাই নি। ওঁর বলার সাথে সাথে  আমিও পকেট থেকে বার করে দেখে তাকে বললাম:
তেইশ ঙ।
(শেষ)
অলঙ্করণ : অপরাজিতা আচার্য 









3 comments:

  1. Darun. Ghurte thakun, dekhte thakun, likhte thakun. Opekhai thaaklum.

    ReplyDelete
  2. এই লেখাটা হেব্বি লাগল পড়ে

    ReplyDelete
  3. লেখাটাতো কদিন আগেই পড়েছি। অলঙ্করণ ব্যাপক। নামটা শেষ পর্যন্ত এটাই হল!

    ReplyDelete