Tuesday, 9 January 2018

সতত তোর, ব্যাঙ্গালোর


ব্যাঙ্গালোর না ব্যাঙ্গালুরু সেসব হিসেব আর করিনি। পণ্ডিতেরা তো রইলই এসবের জন্য। আপাততঃ নিজেকে চার্লি চ্যাপলিনের থেকেও সড়াৎ-উস্তাদ আর সজনে ডাঁটার থেকেও রোগা চিন্তা করে ভিড় ভলভো বাসে হাত বাড়িয়ে শরীর তুলে দাঁড়ালাম যেন বাড়ীর কাজের লোক চপ্পল দিয়ে দেওয়ালে আরশোলা সেঁটে দিল।  পিঠের ব্যাক-প্যাক এর গায়ে দরজা চাপ দিয়ে বন্ধ হয়ে গেল।  যতই বাতানুকূল ব্যবস্থা থাকুক অফিস যাত্রীর বিভিন্ন প্রকারের ডিওর গন্ধে আবহাওয়া মোটেই অনুকুল মনে হচ্ছে না কিন্তু কী আর করা। টিভিতে ডিওর এ্যাডগুলোতে যে সমাজে যেমন ইচ্ছা চলার আমার উড়ুক্কু বেলা এমন একটা ব্যাপার ফুটে ওঠে বলাই বাহুল্য এই অবস্থায় তার কিছুমাত্র সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।  বরঞ্চ মনে হচ্ছে পাথরচাপা কষ্টের মতো ডিওর গন্ধে চাপা শ্বাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের   সময়ে এই প্রযুক্তি আবিষ্কার হলে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বানাতে সুবিধা হত। সে যাই হোক। ভারতের সব জায়গার লোক এই বাসে আছে।  কিন্তু ভারতে যেমন বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য তেমনি এখানেও ন্যাশনাল ইন্টিগ্রিটি। তা হল সারা দেশের লোক অথচ কোন  যাত্রী কোন কথা বলছে না। এর আসল  কারণ অবশ্য অহিংস নীতির মতো অতটা উচ্চাঙ্গের নয়। এর আসল কারণ হল, সবাই কানে কুলুপ এঁটে আছে। কারণ ওই কুলুপের সাথে সংযুক্ত আছে মুঠোফোনের মুঠোভরা সঙ্গীত।  আজ্ঞে হ্যাঁ। এই ভিড়েও সবাই প্যাঁ পোঁ রেডিও বা পছন্দের গান শুনছে। আর যারা বসতে পেয়েছে তাদেরও কানে কুলুপ আর চক্ষু স্থির এক্কেবারে অর্জুনের চক্ষু দেখার মতো তবে  মুঠোফোনে।

সেদিন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি। একটা কথা বলে নেওয়া দরকার,  ব্যাঙ্গালোরে রাস্তায় চলার সময় সবাই নাকমুখ ঢেকে চলে। নারী পুরুষ নির্বিশেষে বোরখা আর হিজাব পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তবে তার রঙ কালোর বদলে হরেক। তাই কেউ কারুর মুখ দেখতে পায় না। ফলত সবাই আক্ষরিক অচেনা। বলা বাহুল্য আগে থেকে জানা চেনা লোকেও যদি পাশ দিয়ে চলে যায় তাহলেও চেনার উপায় নেই। পৃথিবীতে যত ধুলো আছে সব চলে এসেছে ব্যাঙ্গালোরে। যেন উপার্জনের কোন নতুন রাস্তা খুলে গেছে নিকটবর্তী কোন শহরে তাই সমস্ত প্রান্তিক মানুষেরা গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসছে। খুব বেশীদিন নেই যখন এরকম লোকে বলতে শুরু করবে যে, ভারতের যেকোন এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে যদি দেখ সবথেকে বেশি ধুলোমাখা প্লেন নামছে সেটাই চোখ বন্ধ করে বলা যায়  ব্যাঙ্গালোর থেকেই আসছে। যেমন অনেককাল ধরেই হাওয়াই চটি সার সার ভীড় দেখলেই বোঝা যেত এ ট্রেন কোথায় যাচ্ছে।  

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য হল ওই চক্ষু স্থির মুঠোফোন।  রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতেও  এক হাত রুমাল নিয়ে ধুলোর থেকে বাঁচতে নাকে মিথ্যে চাপা দেওয়া আর অন্য হাতের চেটোয় মোবাইল শুইয়ে ধরে তার পর্দায় চোখ রেখে হেঁটে চলেছেন লালরেড্ডিসাহুমুখার্জী সকলেই। অসীম স্কিল। আমার এক বন্ধু ছিল। চটজলদি পদ্য আওড়াত। কখনও মৌলিক কখনও প্যারোডিতে। এই ছবি দেখলে নির্ঘাত এরকম একটা বলে ফেলত:

চোখ ফেটে আসে জল

এমনি করে কি শহর জুড়িয়া

চোখ খাবে দুর্বল।

চোখ থেকে ফুসফুস হুস করে সব কলকব্জা একদিন জবাব দিয়ে দেবে এমনিই এ শহরের বর্তমান অবস্থা।

পরে সময় করে এ শহরকে আরো বিস্তারিত বলা যাবে। এখন শুধু আর একটা কথা আর সেটাই খুব ভাববার কথা। একটা ব্যাপারে গোটা ব্যাঙ্গালোর এককাট্টা। আর তা হল কেউ এই শহরকে কোন অজানা কারণে নিজের ভাবেনা। কিন্তু কেন এইরকম। কারুর মনেই কি অনুরণন হয় না, সতত তোর, ব্যাঙ্গালোর।

Monday, 11 December 2017

বিপ্লব - সাবজেক্ট টু মার্কেট রিস্ক

আজ রাতে ভালো করে জমিয়ে রান্না করো। মাংস ভাত খাব।

হঠাৎ?  অন্যদিন বুঝি খারাপ রান্না হয়?

জিতলাম না। আনন্দ হচ্ছে।

আজ কোন খেলা ছিল না তো।

আরে খেলা থাকবে কেন? বিপ্লব ছিল।

কোথায়? কিছু জানিনা তো। কী নিয়ে?

সব কি জানা যায়? খবর রাখতে হবে।

এই একটু বলো না কী করে জানলে সব বলো।  তাহলে পরের বার বিপ্লবের সময় আমিও যাবো।

শুনবে? শুনলে পুরোটা শোন না হলে মাঝপথে থামালে তাহলে এখনি বলে দাও।

না না। পুরোটাই বলো। দাঁড়াও তাহলে আমি ভাতটা বসিয়ে আসি। এসে শুনছি।

ঠিক এই সময় একটা ফোন এল।

হ্যালো

বলুন।

অভিনন্দন।  জয়ী হয়েছেন। আপনি ছিলেন তো আজ।

আমি না আমরা ছিলাম।

আচ্ছা কাল যে ঘটনা ঘটল তার পরিপ্রেক্ষিতে আপনার মতামত কী?

দেখুন এটা নিয়ে এত ব্যস্ত ছিলাম যে ওটা নিয়ে এখনো ভাবার সময় হয়নি। তবে দেখুন এখনও অবধি যা খবর আসছে তাতে বলা যায় এর  ভিত্তি যদি পর্বতের শিখর ভাবি সে দিক থেকে  হিমালয়ের মতো উচ্চ বলাই যায় আবার সমতলের যে ভিত্তিটা সেটাও ভারত মহাসাগরের মতো হয়ে যাবে।

আপনার মতামত কী হিমালয় না ভারত মহাসাগর।  

এভাবে তো বলা যাবে না। দুদিন ওয়াচ করি। পাল্লা-রোডে যাই। ওখানে কারা আসবে দেখি। তারপর সব বলতে পারব।

আপনি বিপ্লবে যোগ দেবার আগে কোনদিকে পাল্লা-ভারী দেখে নেন থুড়ী পাল্লা-রোড যান

হ্যাঁ অনেক ব্যাপার আছে। পাল্লা-রোড যাই। কারা সেখানে জড়ো হয়েছে খেয়াল রাখি।

অনেক দায়িত্ব। আর কী করেন

আঁতেলদের ভাও দেখি।

আঁতেল? মানে ইন্টেলেকচুয়াল?

ধুস। মিডিয়ায় আছেন ভাষায় দেখছি এক্কেবারে…

ওই দিশেহারা  বুদ্ধিজীবীদের আমরা আঁতেল বলি।

ঠিক করে নেবেন।

আচ্ছা আপনি কাদের কথা বলছেন।

দেখুন  আঁত্রেপেনাঁ মানে যেমন এন্টারপ্রেনর সেই লাইনে আপনাকে ভাবতে হবে। এখানে আঁতেল মানে হল আন তেল। অর্থাৎ যিনি তেল নিয়ে আসেন এক কথায় তেলের ব্যাপারী, তিনিই হলেন আঁতেল।

মানে কলু?

আজ্ঞে হ্যাঁ। তবে এ কলু সে কলু না। অনেক কলুষিত ব্যাপার। না গেলে বোঝা যায় না।

তা কোথায় আপনার এই আঁতেলদের জমায়েত যেখানে আপনি ভাও দেখেন।

আছে। সব বলে দিলে হবে। খুঁজুন না আপনাদের তো অনেক তথ্য বার করবার রাস্তা।

একটু যদি ক্লু দিতেন…

অন্যদিন হবে আজ  একটু ব্যস্ত আছি। রাখি এবার। ওকে পরে আবার যোগাযোগ করব।

কিগো আমি ফ্রি। বলো তোমার ম্যানিফেস্টো কোথায়?

ম্যানিফেস্টো আবার কী?

ওমা। ওই তো সংকল্পদা যা নিয়ে পাগল। রাতদিন শুধু ম্যানিফেস্টো নিয়ে পড়ে আছেন।

ধুস। আগেকার দিনে ওসব ছিল। এখন বিপ্লব করতে এসব লাগেনা।

কী লাগে তাহলে।

দেখো বিপ্লব হল একটা বাজার। এখানে অনেককিছু দেওয়া নেওয়া চলছে। তোমাকে খালি দেখে নিতে হবে কোন বিপ্লবে তোমার যোগদান সবচেয়ে কম ক্ষতি বা একদম ক্ষতি নেই অথচ এট্টুয়াট্টু লাভ পেয়ে গেলে।

বিপ্লব করলে ক্ষতি?

হ্যাঁ। ক্ষতি তো বটেই। এটা আগেও হয়েছে এখনও হচ্ছে। এই ব্যাপারটা কন্সট্যান্ট।

মানে তুমি সেইসব বীরদের  কথা বলছ? যারা আমাদের সুখের কথা ভেবে প্রাণ দিয়েছেন কেউ ঘর ছাড়া হয়েছেন, কারুর বাড়ী জ্বলে গেছে, কেউ দেশ ছাড়া হয়েছে...

হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক। তবে এখন তারা ইতিহাস। তাই ঐতিহাসিক ঘটনা আমাদের কাছে শিক্ষার ভিত্তি।

মানে?

মানে এই ধরো, কোন বিপ্লবে তোমার প্রাণ যাবার একটা সম্ভাবনা তুমি দেখতে পাচ্ছ কিন্তু ভবিষ্যতে দেখছ তোমার বীর বনে যাবার তেমন সম্ভাবনা নেই। তুমি পিছিয়ে গেলে। আবার কিছুই না করে দেখলে তুমি কদিনেই ওই সংকল্পদার আগে চলে গেলে কোন প্রকল্পে তাহলে সেখানে যুক্ত থাকাটাই শ্রেয়।

মানে তোমার কথায় আজকাল বিপ্লব মানে একটু মার্কেট স্টাডি এই তো।

শুধু তাই নয় যেটা তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তা হল যে কোন বিপ্লব এখন সাব্জেক্ট টু মার্কেট রিস্ক। মিউচুয়াল ফাণ্ডের মতো কোথায় কবে উঠে যাচ্ছে আর কবেই বা মই সরে গিয়ে কেউ কোত্থাও নেই এইটা বোঝাই একটা বোঝা।

তাহলে তুমি যে বললে আজ বিপ্লবটায় জিতেছ। ওই খেলা জেতার মতো।

আবার কথা বাড়ায় চলো চলো মাংস ভাত সাঁটি। তারপর আবার এসব হবে।

****

Thursday, 19 October 2017

গল্পের গরু, একটা সিড়িঙ্গে  গাছ ও অন্যান্য

আমেরিকার সিয়াটেলকে যদি পণ্ডিতেরা উন্নত শহর বলে মানে তাহলে আমি বলব অন্তত কিছু ক্ষেত্রে সিয়াটেলকে সমানে সমানে পাল্লা দেয় আমাদের নদীয়ার দেবগ্রাম। তাও দেবগ্রাম নেহাতই একটা নাম নিতে হয় তাই মায় বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চল বলা যেতে পারে।

এই তো, প্রগতিশীল সুশীল সমাজ কিছুতেই কোন কথা একবারে মানে না। তার প্রমাণ চাই, লিংক ( লিংক হ’ল তথ্যের মুখ। যা খুললেই সিধু জ্যাঠার মতো সব বলে দেবে) চাই, ছবি চাই। তা যাক গে আপনাকে বিরক্ত যাতে না করে একটা প্রমাণ স্বরূপ একটা ঘটনা বলে রাখি।

বাংলার মানুষ এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যাবার জন্য এখনো দুটি যানবাহনের উপর নির্ভরশীল এক হ’ল টিন বা কাঠের বাস আর তার সাথে সাইকেল। একটা সাইকেল যে কতকিছু বইতে আর সইতে পারে মায় চালের বস্তা থেকে গরুর বিচালি তা না দেখলে যেকোন মানুষের তার জীবনটাকেই শুধু যাতনাময় মনে হবে। সে যাই হোক। যা বলছিলাম, যারা দূরে কাজ করতে যান তারা এই সাইকেলটাকে বাসের পিছনে যেখানে সিঁড়ি আছে সেখানে ভাল করে বেঁধে রাখেন। পাকা রাস্তায় বাস থামলে তারা নেমে নিজের নিজের সাইকেল নিয়ে গ্রামে চলে যান নিজস্ব ব্যবসায়।  সিয়াটেলে দেখলাম সেবার বাসে বেশ ভীড়। এক্কেবারে সাহসী লোকের মতো একে অপরের বুক ঠুকে না দাঁড়ালেও বাসে দাঁড়াতে হয়। আর বাসের একদম সামনে জায়গা করা আছে। কী আর, সেই সাইকেল। সাইকেল রাখার জায়গা। লোকে নামছে বাস থেকে তারপর নিজের সাইকেল চড়ে বাকি রাস্তা রওনা দিচ্ছে।  আমি ভাবলাম এই জীবনযাত্রা তো আমাদের ওই দেবগ্রাম কি ডায়মণ্ডহারবার সেই ছোটবেলা থেকে দেখছি।  

আসলে যেই গল্পটা আজ শোনাব বলে মনস্থির করেছি সেটা ওই সহনশীল সাইকেলটা না। সাইকেলের সাথে যে বড় ঝুড়িটা বাসের পেছনে রথের চাকার মতোন লাগান আছে সেইটা আর তার মালিক ওই বাসের ছাদে মাথায় গামছা ওকে নিয়ে। ঝুড়িটা যে এই শীর্ণ অথচ পরিশ্রমী লোকটার এগিয়ে চলার রথ এই বক্তব্যটা গল্পে প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু কীভাবে গল্পটা শুরু করা যায় সেটারই সকাল থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছি।  এগুলো কিন্তু আপনার জানা থাকলে পরে গল্পে গল্পে গল্পকারকেও চেনা যাবে তাই না।

যেমন এই ধরুন না, নোবেলজয়ী ডরিস লেসিং তাঁর সংগ্রামী সময়ে পড়ার মতো বই কাছে না পেয়ে  ঠোঙার লেখা পড়ে পাঠতৃষ্ণা মিটিয়েছিলেন।  সেই সময়কার অভিজ্ঞতায় কত উচ্চমানের সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন।  আমি তো তা জানার পর থেকে সেই সকালে প্রথম আলোকে  কাঞ্চনজঙ্ঘা মুকুটের মতো হওয়া থেকে দীঘার সূর্যাস্তের গোধূলি জল ইস্তক বইপত্তর গুছিয়ে রেখে খালি ঠোঙা ছিঁড়ে পড়ছি।  শুধু গল্প লেখাটা হয়ে ওঠেনি। বাকি সব হয়েছে। খিদে ঘুম সব।

এখন গল্প লেখা না হলেও সমাজে যে অনাচার অত্যাচারের সীমা নেই তা বেশ এই ঠোঙা পড়ে বোঝা গেল। তাই ওই আগের গল্পটা বাতিল। ওটা আর লিখে কাজ নেই।  একটা নতুন গল্প শুরু করব তার থেকে এই সামাজিক প্রেক্ষাপটে। পরে এটা এতো জনপ্রিয় হবে যে টিভিসিরিয়াল হ’য়ে যেতে  পারে। কিন্তু সব কিছুর তো একটা শুরু চাই।

এমন ভাবতে ভাবতে পাড়ার গম্ভীরানন্দ গড়করি  দাদার সাথে দেখা।  আমি কেন পাড়ার সকলেই ওনাকে গড় করেন মনে মনে।  তার কারণ তীক্ষ্ণ ওনার জ্ঞান। মোটামুটি মিনিট দশেক কথা বললে জ্ঞানের তীক্ষ্ণতায় গায়ে হুল ফুটে যায়। তাই সকলে ওনার পুরো কথা না শুনে অল্পেই আলাপ শেষ করতে চায়। আমিও তো চালাক না কি! সে যাই হোক। ওনার সাথে কথা বলে ঠিক হ’ল ওসব সিরিয়াল ফিরিয়াল না।  হবে যখন বেশ একটা বড় পর্দার জন্য কিছু হোক।

হঠাৎ মনে পড়ল ঠিক যেমন পটাং করে বাসের টায়ার ফেটে যায় তেমন হঠাৎ করে আমার জ্ঞানচক্ষু উদ্ভাসিত হয়ে মনে হল পৃথিবীর তাবড় তাবড় লেখক কিছু পান না করে কলমে হাত দেননি।  সে সেকালে সোমরস হোক কি একালের মঙ্গলরস।  যেমনি ভাবা অমনি যোগাড় করবার জন্য একটা  কাঁসার ঘড়া ( বাড়ীর খাটের তলায় রাখা ছিল। আমার ঠাকুমার শ্বাশুড়ি মানে আমার বড় ঠাকুমা না কি বিয়েতে এটা পেয়েছিলেন)  নিয়ে গায়ে জামা গলিয়ে রস গ্রহণে মন দিলাম।

রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছি। আকাশে রোদ্দুর বাঁধনহারা তাই যেখানে পারছে চাঁটি মেরে জ্বালাচ্ছে। বাজারের কাছে আসতে প্রলয়প্রখর এগিয়ে এল। একথা সেকথার পর যখন সে জানতে পারল আমি সোমরস থেকে রবিরস কিছু একটা পাবার আকাঙ্ক্ষায় ঘাম ঝরাচ্ছি তখন সে আমাকে হতাশ করল। বলে আজ বাজার বন্ধ। রস কিছু পেতে গেলে রাস্তার ধারের এক খেজুর গাছ দেখিয়ে বলে এতে কিছু থাকলে থাকবে।

একে গরমের দাবদাহ তাতে খেজুর গাছ। আর গাছটা লম্বাও তেমন। কী করি ভেতরে  সাহিত্য রচনার জন্য আকুপাকু অবস্থা। এই অবস্থা শুধু তাঁরাই জানে যারা নদীতে না নেমে নদীর কথা লেখে না সেখানে আমিই বা এই গাছটায় না উঠলে কী করে গাছের কথা লিখব। তাই সেই ঘড়া খানা কোমরে বাঁধলাম তারপর হাঁটু পায়ের পাতা আর সজনে ডাঁটার মতো আমার এই হাত দু খানি নিয়ে প্রবল পরাক্রমে গাছে উঠতে থাকলাম।

গাছে উঠছি আর দেখছি এর আগে কত কত সাহিত্য রচয়িতা এই গাছে আমার মতো উঠেছেন। জায়গায় জায়গায় গাছের ছাল চেঁছে সংগ্রহ করেছেন শক্তের ভেতরে কোমলের আনাগোনা।  এখান থেকেই হয়ত সেই বিখ্যাত ‘সীমার মাঝে অসীম’ আর ‘অসীমের মাঝে সীমা’ র আবিষ্কার।  এই ভাবতে ভাবতে আমি যেন ভেসে যাচ্ছি অসীমের মধ্যে।  আমি এই বিরাট পৃথিবীর এক ক্ষুদ্র মানুষ।

অন্ধকার শেষ হলে যেমন আলো তেমনি এই অসীম শূন্যতাও আমার বোঝার আগেই শেষ হয়ে গেল। ঘড়া,  দড়ি,  লিকপিকে হাত পা শীর্ণ শরীর সমস্ত নিয়ে কঠিন বাস্তবের মতো রাস্তার উপরে আমি চিৎপটাং হয়ে পরলাম। কতক্ষণ জানিনা, যেন ঘুমাচ্ছিলাম। দূর থেকে আওয়াজ আসছে,

মাথায় জল দে, আগে অজ্ঞানতা কাটুক।


Wednesday, 28 June 2017

ঙ - একটি গল্প

( এই লেখাটির অলঙ্করণ করেছে অপরাজিতা আচার্য)  

হায়দ্রাবাদ থেকে আজ রাতের ফ্লাইটে ফিরব ব্যাঙ্গালোর।  সন্ধ্যে হয়ে গেছে তাও  চলছে জেনেরেল ম্যানেজারের সাথে তথ্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ দড়ি টানাটানি।
ভগবানের থেকেও শক্তিমান আর  আল্লার থেকেও পাল্লা ভারী সেই মহামান্য (মানব বা মানবী দুই হতে পারে) ক্লায়েন্টকে তিনি নিবেদন করবেন আমাদের এই তথ্যকোষ। তাই এতো গ্রিল-সেঁকা  চলছে বিপুলায়তন তথ্যভাণ্ডার নিয়ে।  তথ্যের তালুকদারি।
কাজের পরিধিটা ছোট করে বোঝা যাক। এই ধরা যাক আমরা প্রচুর পরিশ্রম করে প্রকাশ করলাম রতন গরমকালে আম বেশী খায়। এইবার তা নিয়ে আমাদের অনুসন্ধান মার্কা কাজ শুরু হল।  তিনি জানতে চান পাকা আম না কাঁচা আম,  সস্তা আম না দামী আম, আম কেটে খান না দাঁত দিয়ে একটা ছোট্ট মুখ কেটে তারপর আমকে চেপে চেপে মুখে শাস নেন। এইসব তথ্যের সাথে আমরা  হয়ত আর একটু জানালাম গরমকালে আমের আমদানি বাজারে বেশী হয় ঠিকই কিন্তু রতন তার জন্য যে গরমকালে বেশি আম খায় তা নয় সে নিদারুণ দাবদাহেই আম খেতে পছন্দ করে।
যাই হোক। যা বলতে চাইলাম এইসব ছাইভস্ম করতে করতে সন্ধ্যে উতরিয়ে গাঢ় হল। সিধুজ্যাঠাকে জিজ্ঞেস করে জানা গেলো এয়ারপোর্ট যেতে মোটামুটি পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগবে। আমাদের টিকিট বলছে আমাদের  আর ঠিক পঁয়তাল্লিশ মিনিটই আছে এই টিকিটে ভ্রমণের জন্য। আমরা পড়ি মরি করে সমস্ত মুঠোফোন একযোগে ট্যাক্সি দেখতে থাকলাম।


বলাই বাহুল্য, এই সময়ে রাস্তায় খালি ট্যাক্সি নেই। পাঁচ মিনিট পাঁচ ঘন্টা মনে হতে থাকল। কপালে বিন্দু বিন্দু শিশিরবিন্দু কিন্তু মনে তাতে কাব্য নেই আছে দুঃসহ দুশ্চিন্তা। অবশেষে একটা খুব ভালো বড় গাড়ী পাওয়া গেলো। আমরা চালককে একটু জোরে গাড়ী চালাতে বলে এক একটা কথা বলছি আর মিনিট হিসেব করছি।
হায়দ্রাবাদ থেকে এয়ারপোর্ট যেতে একটা লম্বা হাইরোড পড়ে যেটা আবার ফ্লাইওভার যা সোজা এয়ারপোর্টকে যুক্ত করেছে পনের ষোল কিলোমিটার পর। সেই টানা উপরসড়ক ধরে আমরা চলতে থাকলাম। মনে হচ্ছে আর একটু জোরে চলুক হয়ত পেলেও পেতে পারি অমূল্য আকাশযান।
যেভাবে গাড়ী চলছে মনে হচ্ছে সময়ে বা সময়ের থেকে  মিনিট পাঁচেক পরে পৌঁছন যাবে। আমরা তিনজন আলোচনা করছি হয়ত একটু অনুনয় বিনয় করলে হয়ত হ্যাঁ হয়ত পেয়ে যাবো। গভীর রাতে পৌঁছে যাবো ব্যাঙ্গালোরে। কদিনের কাজ শেষে রাতে বিশ্রাম নিজের বাড়ীতে। ঠাণ্ডা কম্বলের ওম নিয়ে শান্তি।  হঠাৎ ফটাস আওয়াজ যোগে বাঁ দিকের পেছনের চাকা ফেটে গাড়ী খোঁড়াতে খোঁড়াতে সেই উপরসড়কের মাঝে দাঁড়িয়ে গেলো। যাচ্চলে।
দ্বিতীয় পর্ব:
উপরসড়কে উসেইন বোল্টের মতো দ্রুত চলে যাচ্ছে গাড়ি একটার পর একটা আমাদের পাশ দিয়ে। আমরা তিনজন রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে চিন্তামগ্ন হয়ে ভাবছি কী করা যায়। কর্পোরেট ভাষায় যাকে বলে স্ট্র‍্যাটেজি।
এখানে তিনজনের একটু পরিচয় দেবার দরকার। আমি তো সেই লিকপিকে সিং। বাঙালী। আমার সাথে কেরালার ছেলে ব্রিজিতলাল। সকালে জিমে না গেলে অফিসে মন বসে না। বয়স ত্রিশ। আর রোমানিয়া থেকে এসেছে এই কাজে জোসেফ। আসলে ও গোয়ানিজ পরিবারের ছেলে তবে এখন আর বাবা মা অনেককাল ভারতে থাকে না।  ওর বয়স ত্রিশের একটু বেশী। বুদ্ধিদীপ্ত আর ছিপছিপে চেহারা।  আমি এখানে বয়োজ্যেষ্ঠ।
আমি বললাম, আর চেষ্টা করে লাভ নেই। ঠিক আটটা বিয়াল্লিশ বাজে। আটটা পঁয়তাল্লিশ আমাদের চেক ইন টাইম কারণ সাড়ে নটায় রওনা।
জোসেফ বলল, বুঝছি। অফিসের ট্র‍্যাভেল ডেস্কে একটা ফোন করলে হয় না। যদি ওরা আমাদের ট্র‍্যাভেল রিসিডিওল করে?
আমি বললাম, ভাল কথা। আমিই করছি।  কম্পানির হেল্পডেস্ক নাম্বার ডায়াল করে এক দুই তিন ইত্যাদি বাছাবাছি করে নিজের ক্রমিক সংখ্যা দাবিয়ে অবশেষে কেউ হ্যালো বলল। যেন স্বর্গদ্বার এসেছি। নারায়ণের   কাছে যেতে গেলে এক টিপুন,  কৃষ্ণর কাছে যেতে হলে দুই টিপুন আর সোজা ব্যোমভোলের কাছে নালিস করতে শূণ্য টিপুন।
হ্যালো, আমি হায়দ্রাবাদের এয়ারপোর্ট এর কাছাকাছি উপরসড়কের মাঝে অসহায়ভাবে দাঁড়িয়ে আছি আমাদের ট্যাক্সির টায়ার ফেটে গেছে। আমার সাথে আরো দু’জন আছে। আমাদের আকাশযান সাড়ে নটায়। বুঝতেই পারছেন, কোন মতেই তা আর পাওয়া সম্ভব না। আপনি কী পরের কোন যাত্রার ব্যবস্থা করবেন দয়া করে?
একমিনিট স্যার। এটা আপনার কোন এয়ারলাইন্স ?  
নীলদর্পণ আকাশপথ।
ওকে। একটু দেখে নিতে দিন স্যার। উম ম ম এক মিনিট স্যার।  (কিছুটা অপেক্ষা) স্যরি স্যার। আজ আর কোনখানে টিকিট নেই।  একবার চেষ্টা করুন স্যার এটা ‘নো সো’ হলে আপনাকে  নতুন করে সব ব্যবস্থা করতে হবে।
এখানে কথা বলে কিছু লাভ নেই বুঝে মুঠোফোন বন্ধ করলাম।  ইতিমধ্যে বাকি দু’জন চেষ্টা চালিয়েছে যদি অন্য একটা ট্যাক্সি পাওয়া যায়।  সে গুড়ে বালি। এই মাঝরাস্তায় এতো দূরে কে আসবে?  তাও একজনের মুঠোফোনে  দেখালো পনের মিনিট আর একজনকে কুড়ি মিনিট পর ট্যাক্সি আসবে।
পনের কুড়ি মিনিট পর আর এসে কী হবে এই আলোচনা করছি। হঠাৎ একটা হলুদের উপর গাড়ীর নাম্বার লেখা গাড়ী আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। আমরা ভাবলাম ভাড়ার গাড়ী হয়ত আমাদের ট্যাক্সি।
ব্রিজিতলাল বলল না আমার নাম্বারের সাথে মিলছে না। জোসেফও তাই বলল।
হঠাৎ চালক আমাদের সামনে এসে বলল, আপলগ এয়ারপোর্ট যাওগে? মেরা সাথ যাওগে?
আমার সোনারকেল্লার সেই দৃশ্য মনে পড়ল। কাঁচের বোতলে টায়ার ফেটে বিপর্যস্ত ফেলুলালতোপকে তাদের ড্রাইভার বলছে, আপলোগ উটপে যাওগে?
ব্রিজিতলাল বলল, লেটস ট্রাই না! জোসেফ জোরের সাথে সমর্থন করল। আমরা লোটাকম্বল নিয়ে সেই গাড়ীতে কোনরকম দরদাম না করে যেমন চাইল তাতে রাজী হয়ে গিয়ে উঠে পরলাম।
ড্রাইভার ভাই, ইধার সে কিতনা টাইম লাগেগা?
স্যার পন্দরা বিশ মিনিট লাগতা হ্যায়!
আরো পনের কুড়ি মিনিট। আমি হিসেব করে দেখলাম তারমানে ন টা বেজে দশ মিনিট যদি পনের মিনিট লাগে। সাড়ে নটায় রওনা। কেন যে আর চেষ্টা করছি।  তাও চালককে বললাম, ভাইয়া থোড়া জলদিমে হুঁ। সে সাড়া দিল, জি স্যার এয়ারপোর্ট তক তো জলদি যায়েঙ্গে লেকিন উসকে বাদ অন্দর পে ট্র‍্যাফিক তো রাহেগায়।  আমি শুধু হু বললাম।
ইতিমধ্যে জোসেফ সিধুজ্যাঠার মাধ্যম ব্যবহার করে বলল,  আমাদের আকাশযান একদম সঠিক সময়ে ছাড়বে।
আমরা সবাই হাসলাম বেশ জোরে জোরে। আর এক সাথে বললাম আজ আর কিছুতেই বিলম্ব থাকতে পারে ন।
তৃতীয় পর্ব:
সোনারকেল্লার উটে চড়ার  মতো মাঝ রাস্তায় বাহন পরিবর্তন হলো ঠিকই কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে এ গাড়ীর গতি ছিল অনেক বেশি। কিন্তু কত জোরে একটা গাড়ি ভারতের রাস্তায় চালানো যায়! গাড়ি একশ কুড়ি কিলোমিটার গতিতে ছুটছে।  হায়দ্রাবাদের রাস্তাকে সেলাম জানাতেই হয়। এভাবে চললে যা বুঝলাম ড্রাইভারের সাথে কথা বলে, মোটামুটি ন’টা বেজে দশ মিনিটের মধ্যে হয়ত আমরা এয়ারপোর্ট পৌঁছব।  অর্থাৎ হিসেব মতো বোর্ডিং শুরু তো হবেই সম্ভবত বোর্ডিং এর ‘ফাইনাল কল’ হবে আমরা এয়ারপোর্ট পা রাখতে রাখতে।  তাই বলাই বাহুল্য এ যাত্রায় নীলদর্পন আকাশযান এ দিনের বন্ধু হল না। এয়ারপোর্ট গিয়ে অন্যকিছুর ব্যবস্থা করতে হবে।
আমি বললাম, আচ্ছা এখানে কাছাকাছি হোটেল নিশ্চয় থাকবে। সব এয়ারপোর্ট এর কাছেই তো ভালো ভালো হোটেল থাকে।
জোসেফ বলল, হ্যাঁ সে পাওয়া যাবে। তবে হাল ছেড়ো না এতো তাড়াতাড়ি। আমরা একটু কাঁদুনি গাইব যে রাস্তায় প্রচুর ট্র‍্যাফিক।
ব্রিজিতলাল বলল, সে না কি ব্যাঙ্গালোরে একবার বৃষ্টির দিনে প্রজেক্টের কাজে এয়ারপোর্ট আসতে গিয়ে  ট্র‍্যাফিকে ফেঁসেছিল আর এয়ারপোর্ট পৌঁছে দেখেছিল বেশিরভাগ লোক আসতে পারেনি নির্দিষ্ট সময়ে তাই বেশ কয়েকটা আকাশযান বিলম্বে ছাড়ার ব্যবস্থা হয়েছিল।  
আমি ভাবলাম এ ব্যাঙ্গালোরেই সম্ভব। আর বললাম, দেখো, ওরা যদি বলে বাকিরা এসে গেলো কীভাবে আমাদের কিছু বলার থাকবে না। বরঞ্চ যদি কিছু বলতেই হয় আমরা রাস্তায় আমাদের সাথে যেমনটি হলো আমরা তাই বলব। এতে ঘটনা থাকবে  সত্যি তাই বিশ্বাস যোগ্যতা বাড়বে।
আমরা কথা বলতে বলতে অবশেষে এয়ারপোর্ট এসে পৌঁছলাম। ঘড়িতে বাজে ন'টা বেজে বারো মিনিট।  গাড়ির চালককে ভাড়া মিটিয়ে নিজের নিজের তল্পিতল্পা নিয়ে প্রধান প্রবেশপথে এলাম।
প্রথম প্রবেশপথে  যে সিকিউরিটির লোক থাকে তাকে টিকিট দেখানোর সাথে দেখাতে হবে পরিচয়পত্র। আমরা তিনজনই নিজের নিজের পরিচয়পত্র বার করে মুঠোফোনে টিকিট দেখালাম।  সিকিউরিটি কর্মী খুব যত্ন সহকারে মেলাতে লাগল আমাদের নামছবি।  উফ ছাড় না বাবা আমরা ঠিক লোক। বলাই বাহুল্য, এটা মনে মনেই বললাম। সুরক্ষাকর্মীদের সাথে সতত সাহায্যের হাত বাড়ানোই যেকোন সময় যেকোন নাগরিকের অবশ্য কর্তব্য। আমরা কেউই তার অন্যথা করলাম না।
টিকিট পরীক্ষার পর এক ছুটে আমরা গেলাম যেখানে ‘চেক-ইন’ করে বোর্ডিং পাস দেওয়া হবে। কিন্তু এগুলো একটাও নীলদর্পন নয়। তাদের কাউন্টার আরো একটু পেছনের দিকে।  পড়িমরি করে সেদিকে ছুট দিলাম। যখন আমরা কাউন্টারে পৌঁছলাম সেখানে বিস্তর ভিড়।
অ্যাকোরিয়ামে কিছু মাছ যেমন উদ্দেশ্যহীনভাবে একবার এ দেওয়াল একবার ও দেওয়াল ঘুরে বেড়ায় লেজ নেড়ে নেড়ে যেন কোন কাজ নাই এ জীবনে ঠিক তেমনি  এয়ারপোর্টে একদল কর্মী ‘মে আই হেল্প ইউ’ হাতে আর বুকে লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কাছেই তেমন একজনকে ধরে নিল ব্রিজিতলাল।
আমাদের সাড়ে ন’টার  ব্যাঙ্গালোর। আমাদের একটু আগে ব্যবস্থা করতে পারেন?
সাড়ে ন'টার ব্যাঙ্গালোর? এখন ন’টা পনেরো বাজে। আমি জানিনা স্যার আপনারা কতটা উপকার পাবেন। আমার সাথে আসুন। এই যে এই কাউন্টারে কথা বলুন।
আমরা তিনজনই প্রস্তুত কী বলতে হবে। যেন ‘ভাইভা’ চলছে।  আমরা প্রথম শুরু করলাম এইভাবে, সাড়ে ন’টার ব্যাঙ্গালোর আমরা রাস্তায় আটকে গেছিলাম।
ব্যস। ওইটুকু বলার পর নীলদর্পন কর্মী আমাদের আর কিছু বলতে দিলেন না। লে হালুয়া। কিন্তু আমাদের টিকিট নিলেন। তারপর নিজের ‘টার্মিনালে’  কিছু ‘চেক’ করলেন। তারপর একটা ফোন লাগালেন। আমরা দর্শক। যেন রহস্য রোমাঞ্চ সিনেমা দেখছি। কিন্তু লালমোহন বাবুর লেখা গল্প  নয় নিজস্ব ‘আঁখো দেখি’।
স্যার, আমার কাছে তিনজন এসেছেন ব্যাঙ্গালোরের জন্য।
অন্যপারে কী কথা হচ্ছে আমরা অবশ্য শুনতে পাচ্ছি না।
আপাতত আমি কাউন্টার ঙ তে আছি।  ক, খ, গ, ঘ কাউন্টারে অন্য আকাশযানের ‘চেক ইন’ চলছে।
আবার অন্যপারে কিছু কথা। এদিকে আমি ভাবছি ঙ না হয়ে অন্য কোন কাউন্টারে গেলেই হোত কি! ঙ যেন কেমন। বাঙালীর ভেতর একদম ঠিক মাঝখানে  ওই ঙ শব্দের জন্যই হয়ত আজ ‘এই অবস্থা’ এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঙ কে ভালো করে ‘হ্যাণ্ডেল’ করতে পারেননি। সহজপাঠে সবার বেলা কি সুন্দর সব ছন্দ অথচ ঙ র বেলায় কী পেলাম:
‘চরে বসে রাঁধে ঙ
চোখে তার লাগে ধোঁয়া।’
বোঝ। যাই হোক। এই নীলদর্পন কর্মী আবার ঙ তে দাঁড়িয়ে আমাদের কী দেয় তাই দেখার।
তিনি ‘ও কে’ বলে ফোন রাখলেন। আমরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে।
আপনাদের কোন ‘চেক ইন লাগেজ’ আছে স্যার?
আমরা একে অপরের সাথে কথা বলে নিলাম।
না নেই।
ওকে।
অতঃপর তিনি কী-বোর্ডে টরেটক্কা করে আমাদের অতি আকাঙ্ক্ষিত সেই  বোর্ডিং পাস দিলেন। উফফফ।  কিন্তু সাথে গুঁজে দিলেন একটা ছোট্ট কোমল সতর্কীকরণ।
স্যার তাড়াতাড়ি  ‘সিকিউরিটি চেক’ করে যাবার চেষ্টা করুন। আপনাদের ‘গেট’ তেইশ। একটু দূর। আর কিন্তু সময় নেই।
এটা সতর্কীকরণ কেন খুলে কই। আগেকার দিনে বোর্ডিং পাস সংগ্রহ করলে আপনাকে না নিয়ে সে আকাশযান এক পা নড়বে না। রওনা দেবার আগে দিকে দিকে তাদের লোকে আপনার নাম আর আকাশযানের নাম ঘোষণা করতে করতে যাবে। যেন সেই ‘আজ কি তাজা খবর, হাতীকে ছেড়ে পিঁপড়ে ধর’ খবরটা বলে  কেউ খবরের কাগজ বেচছে তেমন করে। উদ্দেশ্য যাতে আপনি সাড়া দেন। তারপর সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। এখন আর সেসব নেই। এখন বোর্ডিং পাস পেলেও আপনাকে নির্দিষ্ট সময়ের  ‘ফাইনাল কল’ পর্য্যন্তই তারা সঙ্গে নেবে। যাই হোক এ তো সবাই জানে। তাই সতর্কীকরণ। কিন্তু আমাদের মাথায় আবার  এক বাজ পড়ল। তা  হল তেইশ পর্য্যন্ত আমাদের দ্রুত পৌঁছতে হবে।
তিনজনেই দু হাতে নিজের নিজের লোটাকম্বল নিয়ে দৌড়তে শুরু করলাম।  ঠিক হল, যে আগে পৌঁছবে সে বাকিদের আসার কথা বলে একটু ‘আটকে রাখবে’।  যেন কলকাতার লোকাল বাস। দাদা একজন গলিতে আসছে। আমার লোক। একটু দাঁড়ান। বাস দাঁড়িয়েও থাকে।  যাই হোক।  ব্রিজিতলাল আর জোসেফ প্রায় একসাথে আমার থেকে এগোতে থাকল। প্রথমে দশ মিটার তারপর পঁচিশ পঞ্চাশ মিটার আগে। তারপর আর তাদের দেখতে পেলাম না।  আমিও খুব জোরে দৌড়ে চলেছি। বলাই বাহুল্য সেটা আমার মনে হচ্ছে। কারণ আমি এতোটাই হাঁপিয়ে গেছি মনে হচ্ছে পৃথিবীর তিনভাগ জল দিলেও তেষ্টা মিটবে না। পা দুটো যেন আর চলছে না।
তেইশ নম্বর গেটের কাছে দেখলাম কেউ কোত্থাও নেই একজন শুধু বোর্ডিং পাস চেক করার কর্মী হাত নেড়ে আমাকে ডাকছে। তাঁকে পেরোনোর পর দেখি জোসেফ আর ব্রিজিতলাল আকাশযানের দরজায় দাঁড়িয়ে আমার অপেক্ষায়।
যখন আকাশযানে ঢুকলাম ভর্তি লোক। আমরা তিনজন শুধু বসতে বাকি।  আমাকে হাঁপাতে দেখে এক বিমান সেবিকা আমার ‘সিট নাম্বার’ জানতে চাইল। আমি এতক্ষণ সেই আকাঙ্ক্ষিত বোর্ডিং পাস দেখবারই সময় পাই নি। ওঁর বলার সাথে সাথে  আমিও পকেট থেকে বার করে দেখে তাকে বললাম:
তেইশ ঙ।
(শেষ)
অলঙ্করণ : অপরাজিতা আচার্য 









Tuesday, 27 June 2017

বাসে আর  বাঁশে


আমাদের প্রতিদিনের হতচ্ছ্যেদা এবং ন্যাপোনচোপন পরিষ্কারভাবে  ফুটে ওঠে বাসে আর বাঁশে। খুলে কই।

নতুন চাকরীতে জয়েন করেছে এমন কেউ থেকে পুরোন চাকরীতে খ্যাক খ্যাক করে ‘কেমন দিলাম’ বলে সিগারেট টানা দু নম্বর ফুটবল সাইজের ভুঁড়িওয়ালা অবধি সবাই ব্যাঙ্ক ,  ইন্সিওরেন্স  বা অর্থকরী সংস্থা থেকে, থেকে থেকে আজকাল ফোন পেয়ে থাকে।

হ্যালো স্যার

কে

স্যার আমি ক সংস্থা থেকে বলছি আপনার জন্য একটা ভালো লোন আছে। আপনাকে কিচ্ছু করতে হবে না ( আহা কল্পতরু সেবক সমিতি)।

আমার লোন দরকার নেই।

তাহলে স্যার ক্রেডিট কার্ডটা দেব? একদম ফ্রী ( আপনার টাকা আপনি শোধ করবেন। কোথায় ফ্রী এর প্রশ্ন বুঝতে গেলে ভুরুদ্বয় লাগিয়ে রামের ধনুক করে ফেললেও উত্তর নাও পাওয়া যেতে পারে।) ।  

না আমার ফ্রী তে এ্যালার্জি।

তাহলে একটা গিফট কুপন দেবো?

আপনি হয়ত ভাবছেন এতো  উপকার করতে চায় কেন! একদম বাড়ী চলে আসতে পারে আপনি বললেই। দরকারে আপনার হয়ে আপনার অরিজিনাল কাগজপত্র ‘কপি’ করে নিজেই সাজিয়ে নেবে যা কিছু দরকার। আগেকার দিনে রাজারা এমন সুবিধা পেয়ে থাকতেন আর এখনকার বানিজ্যিক মহারাজরা পেয়ে থাকেন বলাবাহুল্য।

কিন্তু আপনাকে এমন সন্মানীয় করে তোলার কারণ আছে বৈ কী - ওই যে আপনার সন্মতি। আপনার যোগদান।

ঠিক একভাবে ঠিক এরকম খাতির করে আপ্যায়ন করে লোকাল বাসের কণ্ডাকটর। বাসের দাঁড়ানোর কথা নয় এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে আপনার ধীর গতির হাঁটাকে (গদাই লস্করি?) অবলীলায় সহ্য ও সন্মান দিয়ে আপনাকে কোলে তুলে নেবার মতোন করে বাসে তুলে নেবে।

এগুলো হল সেই যাকে বলে সুখের সেসব দিন। বাসনার বাসভবন।

বাঁশভবনের গল্পটা এর পর থেকেই শুরু।  না না বাঁশের কেল্লা তো সবার জানা এ তা নয়।

যা বলছিলাম, আপনি বাসে উঠলেন। ‘মাল নিজ দায়িত্বে’ রাখলেন। এরপর যেই আপনার গন্তব্য এলো কণ্ডাকটরের ‘আসুন আসুন’ হয়ে দাঁড়ালো ‘এখানে দাঁড়ানো যাবে না,  লাফিয়ে নেমে যান নেমে যান’। আপনি পড়িমরি করে প্রাণ হাতে করে নিজের দায়িত্বে কোনরকমে নামলেন।  বাস আপনার গায়ে ধুলো ছিটিয়ে চলে গেলো।

এই বাসে ওঠা আর নামার চিত্রটাই ওই অর্থকরি সংস্থার ‘বিজনেস মডেল’। ঠিক এইরকম আপনি অর্থকরী সংস্থাকে সন্মতি জানাবার পরে অর্থাৎ আপনি ওদের বাসে উঠে পরেছেন। এইবার কোন কিছু সমস্যায় পরলেন বা আপনি আর কিছু তথ্য জানতে চান বা আপনি যে প্যাঁচে পড়েছেন সেখান থেকে বেরোতে চান,  আপনি দেখলেন মরুভুমিতে আপিনি একা।

সেই সব লোকগুলো এখন কোথায়?

সেই এক অখ্যাত কবির হাইকু মনে পড়ল।

তুমি ভরসা!

বিপদমুক্ত হলে

তুমি ফরসা।

Monday, 8 May 2017

হার-মণি-আম


পণ্ডিতরা বলেন, যে সমস্ত বিখ্যাত মানুষদের আত্মজীবনী আছে তার মধ্যে গান্ধীজীর লেখা বইটি সবথেকে বেশী  অকপট রচনায় সমৃদ্ধ। গান্ধীজী তার আত্মজীবনী The story  of my experiments with truth বইতে লিখেছেন তিনি এক সময় বিদেশে পয়সা বাঁচাবার জন্য অনেকটা পথ হেঁটেই যাতায়াত করতেন।

আমরাও পয়সা বাঁচাবার জন্য হাঁটি।  অনেকে হয়ত ওনার থেকে একটু বেশিই হাঁটি। কিন্তু হতাশার মতোন শোনালেও আমাদের হাঁটা ইতিহাসের পাতায় থাকবে না। সে যতই মুখ ভেঙ্গিয়ে ঠোঁট লম্বাটে করে চোখ টেরিয়ে সেল্গি তুলি বা স্যোশাল মিডিয়ায় লায়েক (যিনি লাইক পেতে চান অর্থে) হবার আশায় যতই মোমবাতি নিয়ে হাঁটি।

কিন্তু এর গূঢ় কারণ টা কী? এর গূঢ় কারণটা হল আমরা নিত্যই হারি। জিতি না। সব জায়গায় আমরা হারতে হারতে এগোই। হার আমাদের রাতের রুটি ভাত দিনের  চা সিগারেট। একটা অভ্যাস।  আগেকার দিনে লোকে বলত মানুষ অভ্যাসের দাস। দাস না চক্রবর্তী সেটা এখনকার দিনে বোঝা যায় না। তবে আমরা যেন হেরেই আছি।

এই তো গেল বার যখন এপ্রিল মাস পড়ল। মাসের প্রথম দিন এপ্রিলফুল।  এক বন্ধু বলল আজকের দিনে সবাই ফুল। কিন্তু কী বলব ওই ফুল ফুলিস  নিয়ে ভাবছি আর  মনের মধ্যে ভেসে এলো ফন্দি ফ্যাসাদ ফ্যাকাশে ফাঁকা ফাঁকি ফাতনা ফাঁপা ফেলনা  ফালতু। সব শব্দেই হেরে যাওয়া বা হারার প্রস্তুতি বা হারার ছকে মুখ ডুবিয়ে অপেক্ষা।  

মনের মধ্যে অসীম দু:খ এসে জমা হল। কিছুই কী ভালো হতে নেই। আর এর থেকেই ভাবনাভালুক দুলকি চালে স্বপ্ন দেখে। আহা যদি একটা মণি থাকত হাতের মুঠোয়।

মণিকার নয় সত্যি কারের মণির অধিশ্বর। দুনিয়ার সমস্ত প্রাচুর্য কিনে নেওয়া যেত। সমাজে যত প্রতিপত্তি তা অধিকার করা যেত।  ‘বহু পরিচিত শব্দ সংগ্রাম যেটাকে বাঙালী বলে স্ট্রাগল’ সেটাকে তুড়ি মেরে পাঠিয়ে দেওয়া যেত দূরে নাগালের বাইরে।

ওই যে বললাম হেরে যাবার দৈনন্দিন অবস্থা তার মাঝে এই মণির চিন্তা অনেকটা হার ভুলে কিছু পাবার আকাঙ্ক্ষা।  আর মণিতেই আমাদের সর্বসুখ।  

কেউ হাতে মণি পরে ঘুরে বেড়ায়। সেও এক অজানা ভবিষ্যৎকে ভালো দেখার আশায়। আবার কেউ তার প্রিয়জন কে করে তোলে চোখের মণি। কেউ স্বপ্ন দেখে মিশরের পিরামিডের নিচের জমানো মণি সম্ভারের মতো জমে উঠুক মণিকাঞ্চন। ধ্যান মগ্ন হতে চায় কবে সেই আসবে সুদিন মণিকাঞ্চনযোগ। যেন সেই বিখ্যাত গানের মতো, ‘আশায় আশায় বসে আছি, কবে তোমার আসবে টেলিফোন’।

চোখের মণি হোক কী মণি মাণিক্য হোক এ এক স্বপ্নের বাজার যেখানে সবাই ক্রেতা কোন বিক্রেতা নেই।  বেঁচে থাকবার রসদ পায় মানুষ এই মণির চিন্তায়।  কারণ আমরা আদপে তো আম জনতা।

আম জনতার বেঁচে থাকবার পদ্ধতি হল ওই ঝাঁকি ভর্তি আমের মতোই ঝাঁক বেঁধে। ঝাঁকের ঝোঁক যেদিকে সেদিকেই হেলে পড়লে হল। সে রাজনৈতিক মতবাদ হোক কি পাড়ার দাদা নির্বাচন,  ফ্যাশনের অভিমুখ হোক কি ব্যবসার ঘোর প্যাঁচ,  ঘুস নেবার অভ্যেস হোক কি ঘুস দেবার প্রতিবাদ। সবই ঝোঁক বুঝে।  আর ওই যে প্রথমেই বললাম আমরা সব হারতে হারতে এগোই।

তবে এটাও ঠিক যে,  যখন হার আমাদের বর্তমান তখন মণি আমাদের এগিয়ে যেতে ইন্ধন যোগায় আর এই চক্র সম্পূর্ণ হতেই আমরা আম হিসেবে টিঁকে থাকি। আবার শুরু হয় যাত্রা। না না যাত্রাপালা নয়। সে তো মঞ্চে।

যা বলছিলাম, আবার হার। আবার মণি। আবার আম। এভাবেই বাজে জীবনের এই হার-মণি-আম।